বদর যুদ্ধ - ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ
সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে বদর প্রান্তর অবস্থিত। প্রায় ১৪০০ বছর আগে এই প্রান্তরে এক যুদ্ধ হয়, যাকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বের অন্যতম ‘ইতিহাস-নির্ণায়ক’ যুদ্ধ হিসেবে।
আশ্চর্যের বিষয়, সামরিক দিক থেকে এই যুদ্ধে অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু এই যুদ্ধের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনেও এই দিনটিকে আল-ফুরকান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার মানে, সিদ্ধান্ত বা রায়ের দিন।
মদিনার নবজাতক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই যুদ্ধের গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম।
মক্কার কুরাইশ নেতা ‘আবু সুফিয়ান’ সিরিয়া থেকে অস্ত্র-সরঞ্জামের বিশাল কাফেলা নিয়ে মক্কায় ফিরছিলো।
আবু সুফিয়ানের কাফেলায় এখন পঞ্চাশ হাজার দীনারের মালামাল। বেশিরভাগই অস্ত্রশস্ত্র, এগুলো কিনে আনা হয়েছে সিরিয়া থেকে। মুসলমানেরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় পালানোতে কুরাইশরা খুশিই হয়েছিল, কিন্তু সেই খুশি উবে যেতে বেশিদিন লাগে নি।
শিগগিরই তারা খেয়াল করলো ইয়াসরিব (মদিনায়) মুহাম্মাদ (সাঃ) রীতিমত একটা নগর রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন। এই রাষ্ট্রের অবস্থান মক্কা থেকে সিরিয়ার বাণিজ্যপথের ঠিক মাঝখানে। ইয়াসরিবের নতুন নাম দেয়া হয়েছে মদিনাতুন্নবী (সাঃ)। মূলত তাদের শায়েস্তা করতেই মক্কা থেকে চাদা তুলে আবু সুফিয়ানকে অস্ত্র কিনতে সিরিয়া পাঠানো হয়েছিল।
'মুসলমানরা ইয়াসরিবে চলে গেলে গরমের মৌসুমে কুরাইশদের সিরিয়া ও ইরাকের সাথে যে বাণিজ্য চলতো, তার ঘাড়ের ওপর এই রকম এক বিপদ গজিয়ে উঠতে পারে সেকথা আসলে কুরাইশ সর্দারদের আগেই ভাবা উচিত ছিল।'-আবু সুফিয়ান ভাবলো।
ভেবে ভেবে হাটার সময়ে সামনে এক টুকরো শুকনো উটের বিষ্ঠা দেখলো আবু সুফিয়ান। তারপর, সেটাকে ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখলো, তার মনে হল এটা অন্তত দুদিনের পুরনো বিষ্ঠা।
একজন আরব হিসেবে সে প্রকৃতিগত ভাবেই দক্ষ ট্রেকার, মরুভুমিতে শত্রুর অস্তিত্ব চেনার ক্ষমতা যার নেই, সে জাযিরাতুল আরবের মাটিতে বেশিদিন বেচে থাকতে পারে না।
পানির পাত্র থেকে পানি বের করে উটের বিষ্ঠা ধুয়ে ফেললো সে। বিষ্ঠার ভেতর দুটো বিচি আছে। খেজুরের বিচি। আকারে মক্কার খেজুরের বিচির চেয়ে অনেকটাই পাতলা।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো আবু সুফিয়ান।
এই খেজুর ইয়াসরিবের না হয়ে যায়ই না। এর মানে, অন্তত দুদিন আগে ইয়াসরিবের কেউ তার কাফেলার খবর নিয়ে ইয়াসরিবে চলে গেছে।
এটা যদি সত্যি হয় তাহলে তার কপালে ভোগান্তি ঘনিয়ে আসছে।
সময় থাকতে মক্কায় খবর পাঠানো দরকার। জান বাচাতে হলে এই রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরতে হবে।
কাফেলায় ফিরে দ্রুত উটের মুখ লোহিত সাগরের তীরের দিকে ঘুরিয়ে দিল আবু সুফিয়ান।
তার এই কাফেলায় আছে এক হাজার উট। এদের লুকিয়ে রাখা সহজ ব্যাপার নয়।
মক্কার দিকে দমদম ইবন আমর গিফারীকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
দ্রুত সাহায্য না আসলে এই কাফেলা মুসলমানদের হাতে ধরা পড়বে তা নিশ্চিত।
সাফা পর্বতের দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করলো দমদম ইবন আমর। সে নগ্ন অবস্থায় উটের পিঠে বসে আছে। নিজের ছেড়াখোড়া কাপড় বারবার বাতাসে উড়িয়ে, উটের নাক কেটে দিয়ে, হাওদা উল্টিয়ে সে রীতিমত এক দক্ষযজ্ঞ কান্ড করে বসেছে।
দমদমের চেচামেচিতে কিছুক্ষনের ভেতরেই সারা মক্কা এক হয়ে গেল। খবর রটে গেল, আবু সুফিয়ানের কাফেলা এক হাজার উট আর পঞ্চাশ হাজার দীনারের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুহাম্মাদের (সাঃ) হাতে ধরা পড়তে যাচ্ছে।
কুরাইশ মুরুব্বীরা দারুন নাদওয়াতে বসলেন। যত দ্রুত সম্ভব আক্রমন করে আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে উদ্ধার করতে হবে।
এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছে উতবা ইবন রাবীআ, তার আদরের মেয়ে হিন্দের স্বামী আবু সুফিয়ান। আবু সুফিয়ানকে বাচানো না গেলে চোখের সামনে নিজের মেয়ের বিধবা হওয়া দেখতে হবে।
নাদওয়াতে আবুল হাকাম আমর ইবন হিশামের (আবু জাহল) নেতৃত্বে যুদ্ধ সভা বসলো।
সভায় হাজির ছিল আ'স ইবন ওয়ায়েল, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা, সাফওয়ান ইবন হাকাম, উবাই ইবন খালফ, উকবা ইবন আবি মুয়াইত, উতবা ইবন রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ, আমর ইবন হিশাম, আমর ইবন আদী, আবু লাহাব ইবন আব্দুল মুত্তালিব, আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব সহ গোটা মক্কার সমস্ত নেতারা।
সিদ্ধান্ত হল, আবু সুফিয়ানের কাফেলা গোটা মক্কার কাফেলা। এই কাফেলাকে রক্ষা করতে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। কালই যুদ্ধযাত্রা করা হবে মদীনার দিকে। মুসলমানদের পরাজিত করে মদীনা পর্যন্ত তাড়িয়ে আবু সুফিয়ানকে নিরাপদে মক্কায় নিয়ে আসা হবে। এই যুদ্ধে অংশগ্রহন সকল ব্যক্তি ও প্রতিটি গোত্রের জন্য বাধ্যতামূলক, যদি তারা মক্কায় থাকতে চায়।
যে নিজে যুদ্ধে যাবে না তাকে নিজের বদলে অন্য কাউকে পাঠাতে হবে। কাউকে না পাঠাতে পারলে যুদ্ধের খরচ বহন করতে হবে।
পরদিন এক হাজারেরও বেশি যোদ্ধার এক বাহিনী তৈরি হয়ে গেল। এদের সবাই যে আবু সুফিয়ানের জন্য জীবন বাজি রেখেছিল, ব্যাপারটা তা নয়।
এই কাফেলায় সবারই কম বেশি বিনিয়োগ ছিল, কাফেলা দখল হয়ে যাওয়া মানে নিজের পুজি হারানো। অনেকে আবার বিত্তশালী সর্দারদের কাছে ঋণের জালে আটকে থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের বদলে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হল।
তাড়াহুড়ো করে রওনা হবার পরেও মক্কার বাহিনী ছিল বেশ শক্তিশালী। এক হাজার যোদ্ধার প্রায় দু শ জনই ছিল বর্মে আবৃত, ছয়শত ঘোড়া আর একশত সত্তরটা উট নিয়ে সহস্রাধিক সৈন্যের এই দল মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
বদরে মুসলমানরা তেমন জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে আসেন নি। তারা এসেছেন একটা বাণিজ্য কাফেলা পাকড়াও করতে, যুদ্ধ করতে নয়। বিরাশি জন মুহাজিরের সাথে এসেছেন দু শ একত্রিশজন আনসার। বেশিরভাগের কাছেই অল্প কিছু তীর, ধনুক আর কিছু তরবারি ছাড়া তেমন কোন অস্ত্র নেই। উট আছে মাত্র সত্তরটা, আর ঘোড়সওয়ার কেবলমাত্র দুজন, মিকদাদ ইবন আমর (রাঃ) আর যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ)।
বদরের কাছাকাছি আসার পর তারা জানতে পারলেন যে আবু সুফিয়ানের কাফেলা অন্যপথে চলে গেছে, এবং সামনে আবু জাহলের নেতৃত্বে মক্কার সহস্র সৈন্যের যোদ্ধা দল উপনীত হয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এবার জরুরী পরামর্শ সভা ডাকলেন।
তিনি সাহাবীদের জানালেন, মহান আল্লাহ তাকে কাফিরদের মোকাবিলা করার আদেশ দিয়েছেন। নিজের বাহিনীর শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে তিনি (সাঃ) খুব ভালো করেই জানতেন। এই বাহিনী কোন যুদ্ধের জন্য তৈরি নয়।
নবীজী (সাঃ) তার সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, যে চাও, সে আমার সাথে থাকতে পারো। যে চাও না, সে মদীনায় ফিরে যেতে পারো।
মিকদাদ ইবন আমর (রাঃ) দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন, যতক্ষণ এই দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ আমরা আপনার সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত।
মক্কার মুহাজির সাহাবীদের বক্তব্য পাওয়া গেল, কিন্তু আনসারদের ব্যাপারে নবীজী (সাঃ) তখনো নিশ্চিত ছিলেন না। কুরাইশদের শত্রুতা তো মূলত মুহাজিরদের সাথে, আনসারদের এই শত্রুতায় জড়ানো উচিত হবে কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন।
সা'দ ইবন উবাদা (রাঃ) এই চিন্তা দূর করে দিলেন। তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষনা দিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ), আপনি যদি আমাদের সমুদ্রে ঘোড়া চালিয়ে দিতে বলেন, আমরা আপনার নির্দেশে সমুদ্রেই ঘোড়া চালিয়ে দেবো।
কুরাইশ ক্যাম্পে যুদ্ধজয়ের আগেই উৎসব শুরু হয়ে গেল। উট জবাই করে, মদের স্রোত বইয়ে দিয়ে সাথে নিয়ে আসা মেয়েদের নিয়ে কুরাইশরা ভোগে মত্ত হয়ে পড়লো।
তারা নিশ্চিত ছিল, এই যুদ্ধে তারাই জিততে চলেছে।
এরমধ্যে আবু সুফিয়ানের কাফেলা থেকে খবর এল, তারা এখন বিপদমুক্ত। আবু সুফিয়ান জানিয়েছে, আবু জাহল চাইলে মক্কা ফিরে যেতে পারে।
মক্কার অন্যান্য সরদার, বিশেষ করে উতবা ও ওয়ালিদ বিন মুগিরা এই ব্যাপারে একমত পোষন করলো। তাদের সাথে যোগ দিল বনু হাশিম, বনু জোহরা, বনু আদী ও বনু মুত্তালিব।
আবু জাহল তাদের এই পিছিয়ে যাওয়াকে সহ্য করতে পারলো না। যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে যেতে চাওয়া কুরাইশদের পুরুষত্বকে আক্রমন করে শেষতক সে সবাইকে যুদ্ধের ব্যাপারে একত্রিত করে ফেললো।
১৭ই রমযান, ২রা হিজরী মোতাবেক ১৩ই মার্চ, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের সকালবেলা যখন কুরাইশদের চর উমাইর ইবন ওয়াহহাব ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা গুনে আসলো, সে তখন জানালো, এরা সংখ্যায় তিনশোর কাছাকাছি, অস্ত্রেশস্ত্রে দুর্বল, কিন্তু অত্যন্ত তেজস্বী। মদীনার উটগুলোর গলায় আমি মৃত্যু ঝুলতে দেখেছি।
লড়াই শুরু হওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহর নিকট সিজদায় গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আল্লাহতায়ালা ফেরেস্তা পাঠিয়ে সাহায্য করার ওয়াদা করলেন।
তারপর, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুসলিম বাহিনীকে কয়েকটি কাতারে সাজালেন। যেহেতু সৈন্যসংখ্যা কম ছিল, এবং কোন ঘোড়সওয়ার বাহিনী ছিল না তাই কুরাইশ ঘোড়সওয়ারদের ঠেকাতে বাহিনীর দুপাশেই তীরন্দাজ মোতায়েন করা হল। মুসলিম বাহিনী অবস্থান নিল বদরের প্রান্তরের অপেক্ষাকৃত উচু অংশে,যেখানটা ছিল বালুকাময়। পক্ষান্তরে কুরাইশরা অবস্থান নিল নিচু,নরম মাটির অংশে। মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে সামনে দৌড়ে আগানো কঠিন ছিল।
লড়াই শুরুর আগের এক পশলা বৃষ্টিতে পুরো ব্যাপারটা বদলে গেল। কুরাইশদের দখলে থাকা জায়গাটা কাদায় ভরে গেল, পক্ষান্তরে বৃষ্টিতে শক্ত হয়ে গেল মুসলিম বাহিনীর পায়ের তলায় থাকা জমিন।
অস্ত্র সামান্য থাকায় নবীজী (সাঃ) নির্দেশ দিলেন, শত্রু দুশো কদমের মধ্যে আসলে কেবল তখনই তীর মারতে হবে, এর আগে না। শত্রু পঞ্চাশ কদমের মধ্যে এসে পড়লে বর্শা ব্যবহার করা যাবে, আর দশ কদমের ভেতর এসে গেলে তলোয়ার ব্যবহার করতে হবে।
আরবীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী লড়াই শুরু হল দ্বন্দযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
প্রথমে কুরাইশদের মধ্যে থেকে দ্বন্দযুদ্ধের জন্য নামলো তিন অভিজাত বীর, উতবা ইবন রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওয়ালিদ ইবন উতবা।
তাদের বিরুদ্ধে এগিয়ে এলেন তিন আনসারী যুবক, কিন্তু রাসুলুল্লাহ(সাঃ) তাদের নিষেধ করলেন। আনসাররা আগে কুরাইশদের মুকাবিলা করলে এই সম্ভাবনা প্রবল ছিল যে মুনাফিকরা নবীজীর(সাঃ) বদনাম রটিয়ে বলবে, তিনি মুহাজিরদের নিরাপদে রেখে আনসারদের আগে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
অভিজ্ঞ যোদ্ধা উতবার মোকাবিলা করতে পাঠানো হল হযরত হামযা (রাঃ) কে, অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ শায়বা ইবন রবীআর বিরুদ্ধে এগিয়ে গেলেন সমবয়সী হযরত উবাইদা (রাঃ) আর তরুণ ওয়ালিদ ইবন উতবার বিরুদ্ধে হযরত আলী হায়দার (রাঃ) ।
প্রথমেই ওয়ালিদ তলোয়ার উচিয়ে এগিয়ে এল বীরকেশরী আলীর (রাঃ) দিকে। চব্বিশ বছরের যুবক হযরত আলী (রাঃ) ইস্পাতের মত দৃঢ় স্নায়ুর পরিচয় দিয়ে গলা বরাবর ওয়ালিদের হানা তীব্র আঘাত এড়িয়ে গেলেন, তারপর নিখাদ রিফ্লেক্সে তলোয়ার চালিয়ে দিলেন ওয়ালিদের ঘাড় বরাবর।
ওয়ালিদের কাটা মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
সাহাবী (রাঃ) দের ভেতর তাকবীর ধ্বনি উঠলো, আল্লাহু আকবার!!
ছেলেকে নিহত হতে দেখে ভয়ানক আক্রোশে হযরত হামযার ওপর তলোয়ার চালালো উতবা।
হামযা(রাঃ) সাদা পাগড়ীর ওপর উটপাখির পালকে দিয়ে সজ্জিত মাথাটা ঝট করে সরিয়ে নিলেন, তারপর জোরদার আঘাত হানলেন উতবা ইবন রবীআর ওপর। উতবা আঘাত ঠেকিয়ে দিয়ে পালটা আঘাত হানলো হযরত হামযার (রাঃ) ওপর, আঘাতের প্রচন্ডতায় হামযা(রাঃ) কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন এবং অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় চোখের পলকে সামনে এগিয়ে বজ্রের মত এক মারণাঘাতে উতবার গর্দান উড়িয়ে দিলেন।
আবারও তাকবীর উঠলো, আল্লাহু আকবার!!
ওদিকে শায়বা ও উবাইদা (রাঃ) উভয়েই একে অপরকে মারাত্মক ভাবে আহত করলেন, হযরত উবাইদা (রাঃ) আহত দেখে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত হামযা (রাঃ) দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শায়বাকে হত্যা করে ফেললেন।
আবু জাহল আমর ইবন হিশাম ভাবলো, আর অপেক্ষা না করে এখনই আম হামলা করা দরকার।
জয় হুবাল!! জয় উজ্জা!! স্লোগান দিয়ে কুরাইশরা দলে দলে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ার জন্য এগিয়ে এল।
আক্বানকাল পর্বতের ওপর সিজদায় পড়ে কাদছেন আল্লাহর নবী (সাঃ)।
তিনি বহুক্ষন ধরে সিজদায় পড়ে আছেন।
বারবার আল্লাহর কাছে মিনতি করে সাহায্য চাইছেন।
তিনি জানেন স্বয়ং খোদায়ী হস্তক্ষেপ ছাড়া তার এই বাহিনী কুরাইশদের সামনে টিকতে পারবে না। কেবল কুরাইশ ঘোড়সওয়ারদের সংখ্যাই মুসলিম ফৌজের প্রায় সমান।
ধুলোর ঝড় উঠেছে যুদ্ধের ময়দানে। তিনের বিপরীতে একের এই লড়াই বড় অসম।
নবীজী (সাঃ) কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল্লাহকে বললেন, ইয়া আল্লাহ, আজকে যদি তোমার এই মামুলি বাহিনীটি কাফিরদের হাতে ধ্বংস হয়ে যায়, এই দুনিয়ায় তোমার নাম নেয়ার আর কেউ থাকবে না। ইয়া আল্লাহ তুমি তোমার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পুর্ন করো।
কিছুক্ষণ পর নবীজীর (সাঃ) মুখ যেন নুরের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
তিনি ঘোষনা করলেন, আল্লাহর সাহায্য আসছে।
আগুয়ান শত্রুসেনাদের লক্ষ্য করে হাতে এক মুঠো ধুলো নিয়ে ছুড়ে মারলেন আল্লাহর নবী (সাঃ), তার দেখাদেখি সাহাবীরাও (রাঃ) তাই করলেন।
ঘোর যুদ্ধ শুরু হল।
দুই পক্ষই একে অন্যের ওপর ঝাকে ঝাকে তীর মারতে শুরু করলো।
এরই মধ্যে ময়দানে নেমে এল আল্লাহর সাহায্য।
কুরাইশরা দেখলো, সাদা আলখেল্লা পরা একদল যোদ্ধা লাঠি হাতে ময়দানে নেমে আসছে। এদের সামনে কুরাইশরা দাড়াতেই পারছিল না।
ময়দানে সুরাকা ইবন জুশাম এর চেহারা নিয়ে নেমে এল স্বয়ং ইবলিস শয়তান, আর সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হাজির হলেন হযরত জিবরাঈল আমিন (আঃ) । শয়তান ভয়ে পালিয়ে গেল।
আল্লাহর প্রতিশ্রুতি আল্লাহ পুরন করলেন।
আশ্চর্যের বিষয়, সামরিক দিক থেকে এই যুদ্ধে অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু এই যুদ্ধের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনেও এই দিনটিকে আল-ফুরকান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার মানে, সিদ্ধান্ত বা রায়ের দিন।
মদিনার নবজাতক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে এই যুদ্ধের গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম।
মক্কার কুরাইশ নেতা ‘আবু সুফিয়ান’ সিরিয়া থেকে অস্ত্র-সরঞ্জামের বিশাল কাফেলা নিয়ে মক্কায় ফিরছিলো।
আবু সুফিয়ানের কাফেলায় এখন পঞ্চাশ হাজার দীনারের মালামাল। বেশিরভাগই অস্ত্রশস্ত্র, এগুলো কিনে আনা হয়েছে সিরিয়া থেকে। মুসলমানেরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় পালানোতে কুরাইশরা খুশিই হয়েছিল, কিন্তু সেই খুশি উবে যেতে বেশিদিন লাগে নি।
শিগগিরই তারা খেয়াল করলো ইয়াসরিব (মদিনায়) মুহাম্মাদ (সাঃ) রীতিমত একটা নগর রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন। এই রাষ্ট্রের অবস্থান মক্কা থেকে সিরিয়ার বাণিজ্যপথের ঠিক মাঝখানে। ইয়াসরিবের নতুন নাম দেয়া হয়েছে মদিনাতুন্নবী (সাঃ)। মূলত তাদের শায়েস্তা করতেই মক্কা থেকে চাদা তুলে আবু সুফিয়ানকে অস্ত্র কিনতে সিরিয়া পাঠানো হয়েছিল।
'মুসলমানরা ইয়াসরিবে চলে গেলে গরমের মৌসুমে কুরাইশদের সিরিয়া ও ইরাকের সাথে যে বাণিজ্য চলতো, তার ঘাড়ের ওপর এই রকম এক বিপদ গজিয়ে উঠতে পারে সেকথা আসলে কুরাইশ সর্দারদের আগেই ভাবা উচিত ছিল।'-আবু সুফিয়ান ভাবলো।
ভেবে ভেবে হাটার সময়ে সামনে এক টুকরো শুকনো উটের বিষ্ঠা দেখলো আবু সুফিয়ান। তারপর, সেটাকে ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখলো, তার মনে হল এটা অন্তত দুদিনের পুরনো বিষ্ঠা।
একজন আরব হিসেবে সে প্রকৃতিগত ভাবেই দক্ষ ট্রেকার, মরুভুমিতে শত্রুর অস্তিত্ব চেনার ক্ষমতা যার নেই, সে জাযিরাতুল আরবের মাটিতে বেশিদিন বেচে থাকতে পারে না।
পানির পাত্র থেকে পানি বের করে উটের বিষ্ঠা ধুয়ে ফেললো সে। বিষ্ঠার ভেতর দুটো বিচি আছে। খেজুরের বিচি। আকারে মক্কার খেজুরের বিচির চেয়ে অনেকটাই পাতলা।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো আবু সুফিয়ান।
এই খেজুর ইয়াসরিবের না হয়ে যায়ই না। এর মানে, অন্তত দুদিন আগে ইয়াসরিবের কেউ তার কাফেলার খবর নিয়ে ইয়াসরিবে চলে গেছে।
![]() |
| বদর প্রান্তর |
এটা যদি সত্যি হয় তাহলে তার কপালে ভোগান্তি ঘনিয়ে আসছে।
সময় থাকতে মক্কায় খবর পাঠানো দরকার। জান বাচাতে হলে এই রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরতে হবে।
কাফেলায় ফিরে দ্রুত উটের মুখ লোহিত সাগরের তীরের দিকে ঘুরিয়ে দিল আবু সুফিয়ান।
তার এই কাফেলায় আছে এক হাজার উট। এদের লুকিয়ে রাখা সহজ ব্যাপার নয়।
মক্কার দিকে দমদম ইবন আমর গিফারীকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
দ্রুত সাহায্য না আসলে এই কাফেলা মুসলমানদের হাতে ধরা পড়বে তা নিশ্চিত।
সাফা পর্বতের দিক থেকে মক্কায় প্রবেশ করলো দমদম ইবন আমর। সে নগ্ন অবস্থায় উটের পিঠে বসে আছে। নিজের ছেড়াখোড়া কাপড় বারবার বাতাসে উড়িয়ে, উটের নাক কেটে দিয়ে, হাওদা উল্টিয়ে সে রীতিমত এক দক্ষযজ্ঞ কান্ড করে বসেছে।
দমদমের চেচামেচিতে কিছুক্ষনের ভেতরেই সারা মক্কা এক হয়ে গেল। খবর রটে গেল, আবু সুফিয়ানের কাফেলা এক হাজার উট আর পঞ্চাশ হাজার দীনারের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুহাম্মাদের (সাঃ) হাতে ধরা পড়তে যাচ্ছে।
কুরাইশ মুরুব্বীরা দারুন নাদওয়াতে বসলেন। যত দ্রুত সম্ভব আক্রমন করে আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে উদ্ধার করতে হবে।
এই ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছে উতবা ইবন রাবীআ, তার আদরের মেয়ে হিন্দের স্বামী আবু সুফিয়ান। আবু সুফিয়ানকে বাচানো না গেলে চোখের সামনে নিজের মেয়ের বিধবা হওয়া দেখতে হবে।
নাদওয়াতে আবুল হাকাম আমর ইবন হিশামের (আবু জাহল) নেতৃত্বে যুদ্ধ সভা বসলো।
সভায় হাজির ছিল আ'স ইবন ওয়ায়েল, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা, সাফওয়ান ইবন হাকাম, উবাই ইবন খালফ, উকবা ইবন আবি মুয়াইত, উতবা ইবন রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ, আমর ইবন হিশাম, আমর ইবন আদী, আবু লাহাব ইবন আব্দুল মুত্তালিব, আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিব সহ গোটা মক্কার সমস্ত নেতারা।
সিদ্ধান্ত হল, আবু সুফিয়ানের কাফেলা গোটা মক্কার কাফেলা। এই কাফেলাকে রক্ষা করতে সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। কালই যুদ্ধযাত্রা করা হবে মদীনার দিকে। মুসলমানদের পরাজিত করে মদীনা পর্যন্ত তাড়িয়ে আবু সুফিয়ানকে নিরাপদে মক্কায় নিয়ে আসা হবে। এই যুদ্ধে অংশগ্রহন সকল ব্যক্তি ও প্রতিটি গোত্রের জন্য বাধ্যতামূলক, যদি তারা মক্কায় থাকতে চায়।
যে নিজে যুদ্ধে যাবে না তাকে নিজের বদলে অন্য কাউকে পাঠাতে হবে। কাউকে না পাঠাতে পারলে যুদ্ধের খরচ বহন করতে হবে।
পরদিন এক হাজারেরও বেশি যোদ্ধার এক বাহিনী তৈরি হয়ে গেল। এদের সবাই যে আবু সুফিয়ানের জন্য জীবন বাজি রেখেছিল, ব্যাপারটা তা নয়।
এই কাফেলায় সবারই কম বেশি বিনিয়োগ ছিল, কাফেলা দখল হয়ে যাওয়া মানে নিজের পুজি হারানো। অনেকে আবার বিত্তশালী সর্দারদের কাছে ঋণের জালে আটকে থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের বদলে যুদ্ধে যেতে বাধ্য হল।
তাড়াহুড়ো করে রওনা হবার পরেও মক্কার বাহিনী ছিল বেশ শক্তিশালী। এক হাজার যোদ্ধার প্রায় দু শ জনই ছিল বর্মে আবৃত, ছয়শত ঘোড়া আর একশত সত্তরটা উট নিয়ে সহস্রাধিক সৈন্যের এই দল মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
বদরে মুসলমানরা তেমন জোরালো প্রস্তুতি নিয়ে আসেন নি। তারা এসেছেন একটা বাণিজ্য কাফেলা পাকড়াও করতে, যুদ্ধ করতে নয়। বিরাশি জন মুহাজিরের সাথে এসেছেন দু শ একত্রিশজন আনসার। বেশিরভাগের কাছেই অল্প কিছু তীর, ধনুক আর কিছু তরবারি ছাড়া তেমন কোন অস্ত্র নেই। উট আছে মাত্র সত্তরটা, আর ঘোড়সওয়ার কেবলমাত্র দুজন, মিকদাদ ইবন আমর (রাঃ) আর যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ)।
বদরের কাছাকাছি আসার পর তারা জানতে পারলেন যে আবু সুফিয়ানের কাফেলা অন্যপথে চলে গেছে, এবং সামনে আবু জাহলের নেতৃত্বে মক্কার সহস্র সৈন্যের যোদ্ধা দল উপনীত হয়েছে।
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এবার জরুরী পরামর্শ সভা ডাকলেন।
তিনি সাহাবীদের জানালেন, মহান আল্লাহ তাকে কাফিরদের মোকাবিলা করার আদেশ দিয়েছেন। নিজের বাহিনীর শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে তিনি (সাঃ) খুব ভালো করেই জানতেন। এই বাহিনী কোন যুদ্ধের জন্য তৈরি নয়।
নবীজী (সাঃ) তার সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, যে চাও, সে আমার সাথে থাকতে পারো। যে চাও না, সে মদীনায় ফিরে যেতে পারো।
মিকদাদ ইবন আমর (রাঃ) দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন, যতক্ষণ এই দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ আমরা আপনার সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত।
মক্কার মুহাজির সাহাবীদের বক্তব্য পাওয়া গেল, কিন্তু আনসারদের ব্যাপারে নবীজী (সাঃ) তখনো নিশ্চিত ছিলেন না। কুরাইশদের শত্রুতা তো মূলত মুহাজিরদের সাথে, আনসারদের এই শত্রুতায় জড়ানো উচিত হবে কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন।
সা'দ ইবন উবাদা (রাঃ) এই চিন্তা দূর করে দিলেন। তেজোদৃপ্ত কণ্ঠে তিনি ঘোষনা দিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ), আপনি যদি আমাদের সমুদ্রে ঘোড়া চালিয়ে দিতে বলেন, আমরা আপনার নির্দেশে সমুদ্রেই ঘোড়া চালিয়ে দেবো।
মুসলিম বাহিনী তৈরি হল। সিদ্ধান্ত নেয়া হল, বদরের জলাশয়গুলোকে সামনে রেখে কুরাইশদের মোকাবিলা করা হবে।
হুবাব ইবন মুনযির (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন,বাহিনীকে এই অবস্থানে রাখা কি আল্লাহর নির্দেশ নাকি নবীজীর (সাঃ) ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত??
নবীজী (সাঃ) বললেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
হুবাব বললেন, তাহলে আমার পরামর্শ থাকবে, কুরাইশদের সবচেয়ে কাছের ইয়ালইয়াল কূপটা দখল করে, অন্য কূপগুলোয় পৌছানোর রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে ব্যুহ সাজানোর। এতে কুরাইশরা যুদ্ধের সময় পানি থেকে বঞ্চিত হবে।
নবীজী (সাঃ) পরামর্শ গ্রহন করলেন।
পেছনে আক্বানকাল পর্বতকে রেখে, কূপগুলো দখল করে মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের মুখোমুখি অবস্থান নিল।
নবীজী (সাঃ) এর জন্য পর্বতের ওপর খেজুরপাতার ছাউনি তৈরি করা হল। সেখান থেকে তিনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি দেখতে লাগলেন।
নবীজী (সাঃ) বললেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
হুবাব বললেন, তাহলে আমার পরামর্শ থাকবে, কুরাইশদের সবচেয়ে কাছের ইয়ালইয়াল কূপটা দখল করে, অন্য কূপগুলোয় পৌছানোর রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে ব্যুহ সাজানোর। এতে কুরাইশরা যুদ্ধের সময় পানি থেকে বঞ্চিত হবে।
নবীজী (সাঃ) পরামর্শ গ্রহন করলেন।
পেছনে আক্বানকাল পর্বতকে রেখে, কূপগুলো দখল করে মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের মুখোমুখি অবস্থান নিল।
নবীজী (সাঃ) এর জন্য পর্বতের ওপর খেজুরপাতার ছাউনি তৈরি করা হল। সেখান থেকে তিনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি দেখতে লাগলেন।
কুরাইশ ক্যাম্পে যুদ্ধজয়ের আগেই উৎসব শুরু হয়ে গেল। উট জবাই করে, মদের স্রোত বইয়ে দিয়ে সাথে নিয়ে আসা মেয়েদের নিয়ে কুরাইশরা ভোগে মত্ত হয়ে পড়লো।
তারা নিশ্চিত ছিল, এই যুদ্ধে তারাই জিততে চলেছে।
এরমধ্যে আবু সুফিয়ানের কাফেলা থেকে খবর এল, তারা এখন বিপদমুক্ত। আবু সুফিয়ান জানিয়েছে, আবু জাহল চাইলে মক্কা ফিরে যেতে পারে।
মক্কার অন্যান্য সরদার, বিশেষ করে উতবা ও ওয়ালিদ বিন মুগিরা এই ব্যাপারে একমত পোষন করলো। তাদের সাথে যোগ দিল বনু হাশিম, বনু জোহরা, বনু আদী ও বনু মুত্তালিব।
আবু জাহল তাদের এই পিছিয়ে যাওয়াকে সহ্য করতে পারলো না। যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে যেতে চাওয়া কুরাইশদের পুরুষত্বকে আক্রমন করে শেষতক সে সবাইকে যুদ্ধের ব্যাপারে একত্রিত করে ফেললো।
১৭ই রমযান, ২রা হিজরী মোতাবেক ১৩ই মার্চ, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের সকালবেলা যখন কুরাইশদের চর উমাইর ইবন ওয়াহহাব ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা গুনে আসলো, সে তখন জানালো, এরা সংখ্যায় তিনশোর কাছাকাছি, অস্ত্রেশস্ত্রে দুর্বল, কিন্তু অত্যন্ত তেজস্বী। মদীনার উটগুলোর গলায় আমি মৃত্যু ঝুলতে দেখেছি।
লড়াই শুরু হওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহর নিকট সিজদায় গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। আল্লাহতায়ালা ফেরেস্তা পাঠিয়ে সাহায্য করার ওয়াদা করলেন।
![]() |
| ফেরেস্তারা এখানে অবতরণ করেছিলেন |
তারপর, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুসলিম বাহিনীকে কয়েকটি কাতারে সাজালেন। যেহেতু সৈন্যসংখ্যা কম ছিল, এবং কোন ঘোড়সওয়ার বাহিনী ছিল না তাই কুরাইশ ঘোড়সওয়ারদের ঠেকাতে বাহিনীর দুপাশেই তীরন্দাজ মোতায়েন করা হল। মুসলিম বাহিনী অবস্থান নিল বদরের প্রান্তরের অপেক্ষাকৃত উচু অংশে,যেখানটা ছিল বালুকাময়। পক্ষান্তরে কুরাইশরা অবস্থান নিল নিচু,নরম মাটির অংশে। মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে সামনে দৌড়ে আগানো কঠিন ছিল।
লড়াই শুরুর আগের এক পশলা বৃষ্টিতে পুরো ব্যাপারটা বদলে গেল। কুরাইশদের দখলে থাকা জায়গাটা কাদায় ভরে গেল, পক্ষান্তরে বৃষ্টিতে শক্ত হয়ে গেল মুসলিম বাহিনীর পায়ের তলায় থাকা জমিন।
অস্ত্র সামান্য থাকায় নবীজী (সাঃ) নির্দেশ দিলেন, শত্রু দুশো কদমের মধ্যে আসলে কেবল তখনই তীর মারতে হবে, এর আগে না। শত্রু পঞ্চাশ কদমের মধ্যে এসে পড়লে বর্শা ব্যবহার করা যাবে, আর দশ কদমের ভেতর এসে গেলে তলোয়ার ব্যবহার করতে হবে।
আরবীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী লড়াই শুরু হল দ্বন্দযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
প্রথমে কুরাইশদের মধ্যে থেকে দ্বন্দযুদ্ধের জন্য নামলো তিন অভিজাত বীর, উতবা ইবন রবীআ, শায়বা ইবন রবীআ ও ওয়ালিদ ইবন উতবা।
তাদের বিরুদ্ধে এগিয়ে এলেন তিন আনসারী যুবক, কিন্তু রাসুলুল্লাহ(সাঃ) তাদের নিষেধ করলেন। আনসাররা আগে কুরাইশদের মুকাবিলা করলে এই সম্ভাবনা প্রবল ছিল যে মুনাফিকরা নবীজীর(সাঃ) বদনাম রটিয়ে বলবে, তিনি মুহাজিরদের নিরাপদে রেখে আনসারদের আগে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
অভিজ্ঞ যোদ্ধা উতবার মোকাবিলা করতে পাঠানো হল হযরত হামযা (রাঃ) কে, অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ শায়বা ইবন রবীআর বিরুদ্ধে এগিয়ে গেলেন সমবয়সী হযরত উবাইদা (রাঃ) আর তরুণ ওয়ালিদ ইবন উতবার বিরুদ্ধে হযরত আলী হায়দার (রাঃ) ।
প্রথমেই ওয়ালিদ তলোয়ার উচিয়ে এগিয়ে এল বীরকেশরী আলীর (রাঃ) দিকে। চব্বিশ বছরের যুবক হযরত আলী (রাঃ) ইস্পাতের মত দৃঢ় স্নায়ুর পরিচয় দিয়ে গলা বরাবর ওয়ালিদের হানা তীব্র আঘাত এড়িয়ে গেলেন, তারপর নিখাদ রিফ্লেক্সে তলোয়ার চালিয়ে দিলেন ওয়ালিদের ঘাড় বরাবর।
ওয়ালিদের কাটা মাথা মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
সাহাবী (রাঃ) দের ভেতর তাকবীর ধ্বনি উঠলো, আল্লাহু আকবার!!
ছেলেকে নিহত হতে দেখে ভয়ানক আক্রোশে হযরত হামযার ওপর তলোয়ার চালালো উতবা।
হামযা(রাঃ) সাদা পাগড়ীর ওপর উটপাখির পালকে দিয়ে সজ্জিত মাথাটা ঝট করে সরিয়ে নিলেন, তারপর জোরদার আঘাত হানলেন উতবা ইবন রবীআর ওপর। উতবা আঘাত ঠেকিয়ে দিয়ে পালটা আঘাত হানলো হযরত হামযার (রাঃ) ওপর, আঘাতের প্রচন্ডতায় হামযা(রাঃ) কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন এবং অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় চোখের পলকে সামনে এগিয়ে বজ্রের মত এক মারণাঘাতে উতবার গর্দান উড়িয়ে দিলেন।
আবারও তাকবীর উঠলো, আল্লাহু আকবার!!
ওদিকে শায়বা ও উবাইদা (রাঃ) উভয়েই একে অপরকে মারাত্মক ভাবে আহত করলেন, হযরত উবাইদা (রাঃ) আহত দেখে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত হামযা (রাঃ) দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শায়বাকে হত্যা করে ফেললেন।
আবু জাহল আমর ইবন হিশাম ভাবলো, আর অপেক্ষা না করে এখনই আম হামলা করা দরকার।
জয় হুবাল!! জয় উজ্জা!! স্লোগান দিয়ে কুরাইশরা দলে দলে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ার জন্য এগিয়ে এল।
আক্বানকাল পর্বতের ওপর সিজদায় পড়ে কাদছেন আল্লাহর নবী (সাঃ)।
তিনি বহুক্ষন ধরে সিজদায় পড়ে আছেন।
বারবার আল্লাহর কাছে মিনতি করে সাহায্য চাইছেন।
তিনি জানেন স্বয়ং খোদায়ী হস্তক্ষেপ ছাড়া তার এই বাহিনী কুরাইশদের সামনে টিকতে পারবে না। কেবল কুরাইশ ঘোড়সওয়ারদের সংখ্যাই মুসলিম ফৌজের প্রায় সমান।
ধুলোর ঝড় উঠেছে যুদ্ধের ময়দানে। তিনের বিপরীতে একের এই লড়াই বড় অসম।
নবীজী (সাঃ) কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল্লাহকে বললেন, ইয়া আল্লাহ, আজকে যদি তোমার এই মামুলি বাহিনীটি কাফিরদের হাতে ধ্বংস হয়ে যায়, এই দুনিয়ায় তোমার নাম নেয়ার আর কেউ থাকবে না। ইয়া আল্লাহ তুমি তোমার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পুর্ন করো।
কিছুক্ষণ পর নবীজীর (সাঃ) মুখ যেন নুরের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
তিনি ঘোষনা করলেন, আল্লাহর সাহায্য আসছে।
আগুয়ান শত্রুসেনাদের লক্ষ্য করে হাতে এক মুঠো ধুলো নিয়ে ছুড়ে মারলেন আল্লাহর নবী (সাঃ), তার দেখাদেখি সাহাবীরাও (রাঃ) তাই করলেন।
ঘোর যুদ্ধ শুরু হল।
দুই পক্ষই একে অন্যের ওপর ঝাকে ঝাকে তীর মারতে শুরু করলো।
এরই মধ্যে ময়দানে নেমে এল আল্লাহর সাহায্য।
কুরাইশরা দেখলো, সাদা আলখেল্লা পরা একদল যোদ্ধা লাঠি হাতে ময়দানে নেমে আসছে। এদের সামনে কুরাইশরা দাড়াতেই পারছিল না।
ময়দানে সুরাকা ইবন জুশাম এর চেহারা নিয়ে নেমে এল স্বয়ং ইবলিস শয়তান, আর সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হাজির হলেন হযরত জিবরাঈল আমিন (আঃ) । শয়তান ভয়ে পালিয়ে গেল।
আল্লাহর প্রতিশ্রুতি আল্লাহ পুরন করলেন।
অভিকর্ষ শক্তির বিপরীতে কাদামাটির জমিনে কুরাইশদের ঘোড়াগুলোর গতি ব্যাপকভাবে কমে এল, ফলে সামান্য কিছু তীর নিয়ে নামা তীরন্দাজদের তীরেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে থাকলো শক্তিশালী কুরাইশ বাহিনী। পিছু হটার সময় তাদের ঘোড়াগুলোর পা কাদামাটিতে আটকে যেতে লাগলো।
এসবের ভেতরেই দুই ইয়াতীম আনসারী কিশোর মুয়ায (রাঃ) আর মুয়াওয়ে (রাঃ) এগিয়ে গেলেন যুদ্ধের বিভীষিকার ভেতর।
তারা আব্দুর রহমান ইবন আউফকে (রাঃ) যুদ্ধের ময়দানে দেখে ডাক দিয়ে বললেন, চাচা!! আপনি কি আবু জাহলকে চেনেন??
হযরত আব্দুর রহমান (রাঃ) জানালেন, হ্যা চিনি।
দুই কিশোর বললেন, আবু জাহলকে একটু দেখিয়ে দেন চাচা। যে শয়তান আমাদের নবীজী(সাঃ)কে কষ্ট দিয়েছে, আল্লাহর কসম তাকে যদি আমরা সামনে পাই তাকে শেষ না করে ফিরবো না। তাতে আমাদের যা হয় হবে।
হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) তাদের দেখিয়ে দিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে থাকা আবু জাহলের অবস্থান।
মুসলিমদের পাল্টা হামলায় তখন মাত্র ছত্রভঙ্গ হয়েছে কুরাইশ বাহিনী। এই ডামাডোলের ভেতর আবু জাহলের কাছে পৌছে গেলেন দুই বীর কিশোর। বড় ভাই মুয়ায ছোট ভাই মুয়াওয়েজকে বললেন, আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে বাড়ি গিয়ে মাকে বলবে আমরা তার আদেশ পালন করতে এসেছিলাম। আবু জাহলকে আমরা ছেড়ে দেই নি।
দুই ভাই আবু জাহলের দিকে এগিয়ে গেলেন, একজন আঘাত হানলেন তার ঘোড়ার পায়ে। ঘোড়া বসে পড়লো। অপরজন আল্লাহু আকবার তাকবীর দিয়ে আবু জাহলের পায়ের ওপর আঘাত হানলেন। আবু জাহলের এক পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আবু জাহলের চিৎকার শুনে ছুটে এল কুরাইশ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নেতা, তারই বড় ছেলে ইকরামা। ইকরামার তলোয়ারের আঘাতে কিশোর যোদ্ধা মুয়াওয়েযের এক হাত বিপজ্জনকভাবে কেটে গিয়ে কিছু চামড়ার সাথে বেধে ঝুলতে লাগলো।
মুয়াওয়েয দেখলেন আবু জাহল পালাতে চেষ্টা করছে।
নিজের কেটে যাওয়া হাত এক পা দিয়ে চেপে ধরে জোরে এক টান দিয়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেললেন মুয়াওয়েয, তারপর এগিয়ে গিয়ে দুই ভাই মিলে আবু জাহলের মাথা দেহ থেকে আলাদা করে ফেললেন।
বিকেলের ভেতর কুরাইশরা পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।
সত্তরজন কুরাইশ নিহত হল, সত্তরজন বন্দী হল।
বন্দীদের উটের পিঠে চড়িয়ে, নিজেরা পায়ে হেটে মদীনার দিকে রওনা দিলেন বদরী বাহিনী।
তারা আব্দুর রহমান ইবন আউফকে (রাঃ) যুদ্ধের ময়দানে দেখে ডাক দিয়ে বললেন, চাচা!! আপনি কি আবু জাহলকে চেনেন??
হযরত আব্দুর রহমান (রাঃ) জানালেন, হ্যা চিনি।
দুই কিশোর বললেন, আবু জাহলকে একটু দেখিয়ে দেন চাচা। যে শয়তান আমাদের নবীজী(সাঃ)কে কষ্ট দিয়েছে, আল্লাহর কসম তাকে যদি আমরা সামনে পাই তাকে শেষ না করে ফিরবো না। তাতে আমাদের যা হয় হবে।
হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) তাদের দেখিয়ে দিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে থাকা আবু জাহলের অবস্থান।
মুসলিমদের পাল্টা হামলায় তখন মাত্র ছত্রভঙ্গ হয়েছে কুরাইশ বাহিনী। এই ডামাডোলের ভেতর আবু জাহলের কাছে পৌছে গেলেন দুই বীর কিশোর। বড় ভাই মুয়ায ছোট ভাই মুয়াওয়েজকে বললেন, আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে বাড়ি গিয়ে মাকে বলবে আমরা তার আদেশ পালন করতে এসেছিলাম। আবু জাহলকে আমরা ছেড়ে দেই নি।
দুই ভাই আবু জাহলের দিকে এগিয়ে গেলেন, একজন আঘাত হানলেন তার ঘোড়ার পায়ে। ঘোড়া বসে পড়লো। অপরজন আল্লাহু আকবার তাকবীর দিয়ে আবু জাহলের পায়ের ওপর আঘাত হানলেন। আবু জাহলের এক পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আবু জাহলের চিৎকার শুনে ছুটে এল কুরাইশ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর নেতা, তারই বড় ছেলে ইকরামা। ইকরামার তলোয়ারের আঘাতে কিশোর যোদ্ধা মুয়াওয়েযের এক হাত বিপজ্জনকভাবে কেটে গিয়ে কিছু চামড়ার সাথে বেধে ঝুলতে লাগলো।
মুয়াওয়েয দেখলেন আবু জাহল পালাতে চেষ্টা করছে।
নিজের কেটে যাওয়া হাত এক পা দিয়ে চেপে ধরে জোরে এক টান দিয়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেললেন মুয়াওয়েয, তারপর এগিয়ে গিয়ে দুই ভাই মিলে আবু জাহলের মাথা দেহ থেকে আলাদা করে ফেললেন।
বিকেলের ভেতর কুরাইশরা পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।
সত্তরজন কুরাইশ নিহত হল, সত্তরজন বন্দী হল।
বন্দীদের উটের পিঠে চড়িয়ে, নিজেরা পায়ে হেটে মদীনার দিকে রওনা দিলেন বদরী বাহিনী।
মুসলমানদের ১৪ জন শহীদ হন।






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন